সাফ জেতার পর ব্যস্ততা যেন শেষ হচ্ছে না। কোনো একটি অনুষ্ঠান শেষে শুক্রবার বিকেলে বাফুফে ভবনের চার তলার আবাসিক ক্যাম্পে উঠেছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমা। সাংবাদিক পরিচয় শুনেই ক্লান্তির কথা বলে চলে যেতে চাইলেন। অনেক অনুরোধের পর কয়েক মিনিটের জন্য কথা বলতে রাজি হলেন। এই সময়ে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ট্রফি জেতা এবং নিজের টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। তা শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রশ্ন : শুরুতেই অভিনন্দন সাফ জেতার জন্য।
ঋতুপর্ণা : টুর্নামেন্টের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন, আমরা এবারের সাফে ভালো করতে পারব না। তবে আমাদের নিজেদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল। এটা ঠিক, প্রস্তুতি কম ছিল; কিন্তু আমাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। যেভাবে খেলে শিরোপা জিতেছি, সেটার জন্য আরও ভালো লাগছে। টানা দু’বার সাফের ট্রফি জেতা অবশ্যই বিশেষ কিছু।
প্রশ্ন: সেই বিশেষ কিছুর মধ্যে আপনার নামটিও আলাদাভাবে আছে। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন।
ঋতুপর্ণা : সত্যি বলতে, আমি কখনোই ভাবিনি সেরা খেলোয়াড় হবো। যখন আমার নাম ঘোষণা হলো, তখন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাই। নিজের কাছে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে। সবার কাছ থেকে প্রশংসা পাই, সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি তো আর নেই।
ফাইনালে গোল করা ঋতুপর্ণা সাফের সেরা ফুটবলার হয়েছেন।
প্রশ্ন : দুটি সাফ জিতেছেন। কোনটাকে আপনি এগিয়ে রাখবেন?
ঋতুপর্ণা : গত সাফে আমি নিয়মিত খেলিনি। বেশির ভাগ বদলি নেমেছিলাম। গত সাফের তুলনায় এবার অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। প্রতিটি দলই শক্তিশালী ছিল। ভারত, নেপাল ও ভুটান; এই তিন দলই গোছালো ছিল। বিশেষ করে বলব, ফাইনালের দিনে সবকিছুই নেপালের পক্ষে ছিল। হোম ভেন্যু, দর্শক; সবকিছুই তাদের অনুকূলে ছিল। সে ক্ষেত্রে ফাইনালটা আমাদের জন্য সহজ ছিল না। আমাদের মাথায় ছিল সব প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে লড়তে হবে। এবং আমরা পেরেছি। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে ভালো লাগছে।
প্রশ্ন : পাকিস্তানের সঙ্গে ড্রয়ের পর সবাই আপনাদের সমালোচনা করেছিল।
ঋতুপর্ণা : পাকিস্তানের সঙ্গে ড্র হওয়াটা অবশ্যই অপ্রত্যাশিত ছিল। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি এবং হারতে হারতে ড্র করেছিলাম। সেই খেলার পর মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণা এসেছিল আমাদের নিয়ে। বলতে পারেন, নেতিবাচকই আমাদের উৎসাহ ও সাহস জুগিয়েছে। পাকিস্তান ম্যাচে আমাদের যেসব ভুল ছিল, সেগুলো শুধরে নিয়ে আমরা দ্বিতীয় ম্যাচের জন্য তৈরি হই। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে আমরা সবাই একটা মিটিং করেছিলাম। সেখানে আলোচনা করা হয়, কার কোন জায়গায় ভুল ছিল। দেশের জন্য হলেও আমাদের লড়তে হবে দ্বিতীয় ম্যাচের আগে এ রকম একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। তার পর ভারতকে ৩-১ গোলে হারানোর পর আমাদের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস ছিল, সেটা ফাইনালে কাজে লাগিয়েছি।
প্রশ্ন : ভারতের বিপক্ষে জয়টিই কি আপনাদের মধ্যে বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে?
ঋতুপর্ণা : হ্যাঁ, বলতে পারেন ভারতকে হারানোর পর পুরো দলের চেহারা পাল্টে যায়। সবার মধ্যে বিশ্বাস ফিরে এসেছে, এবার আমরা পারব। তখনই শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
সাফের শিরোপা হাতে ঋতুপর্ণা চাকমা।
প্রশ্ন : নেপালের বিপক্ষে ফাইনালে আপনার করা সেই গোলটি সম্পর্কে বলেন।
ঋতুপর্ণা : আমি বারবার সেই গোলের ভিডিও দেখেছি। মনে হয়, ১০০ বারের বেশি দেখেছি। গোলটা আমার নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য লাগছে। আমি একটুখানি পোস্টের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পরে শুট করেছি আর সেটা গোল হয়ে গেছে। আমি নিজেও অবাক হয়েছি।
প্রশ্ন : কোন গোলটি আপনার কাছে স্মরণীয়?
ঋতুপর্ণা : আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় এই দিনটি (ফাইনাল) হয়ে থাকবে। আমি যে গোলটি করেছি, তা যেমন স্মরণীয়, আর এই গোলে দল জিতেছে বলে আরও বেশি ভালো লাগছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বন্ধুরা এই গোলের জন্য অনেক অভিনন্দন জানিয়েছে। দর্শন বিভাগের অনেকেই এই গোলটি নিয়ে তাদের মুগ্ধতার কথা আমাকে বলেছে।
প্রশ্ন : বিদেশি লিগে খেলার কোনো প্রস্তাব এসেছে?
ঋতুপর্ণা : হ্যাঁ, প্রস্তাব এসেছে। এবারের সাফ খেলে আমার একটা অফার এসেছে। ভাবছি, খেলব কিনা।
প্রশ্ন : সাফ চ্যাম্পিয়ন হলেন, এখন ফেডারেশনের কাছে চাওয়া কী?
ঋতুপর্ণা : ফেডারেশনের কাছে চাওয়া বলতে আমি চাই, যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো সমাধান করুক। যেন আমাদের সুন্দরভাবে পরিচর্যা করা হয়। আমাদের চাহিদাসম্পন্ন সবকিছু বাস্তবায়ন করা হয়। আমরা যে বেতন পাই, মাসের বেতন যেন মাসে পাই। নারী ফুটবলকে যদি আপনি আরও এগিয়ে নিতে চান, তাহলে আমি মনে করি, এই দলের ওপর আরও নজর দিতে হবে। নারী লিগটা ধারাবাহিকভাবে করতে হবে। আর ছেলেদের যে বড় বড় ক্লাবগুলো আছে, তাদের নারী লিগে অংশ নিতে হবে। যদি ওই সব ক্লাব নারী লিগে আসে, তাহলে নারী ফুটবল দল আগামীতে বাংলাদেশকে আরও বড় বিজয় এনে দিতে পারবে বলে বিশ্বাস করি আমি।