nagorbarta
৩১ অক্টোবর ২০২৫, ৬:১৭ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নির্বাচন হবে তো?

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গণভোট সংক্রান্ত সুপারিশকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি সত্যিই ঐকমত্যের পথে যাচ্ছে, নাকি আবারও রাজনৈতিক অনৈক্যের গভীরে নামছে? বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি প্রত্যেকেরই সুর ভিন্ন। অন্যদিকে, হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ ও রয়টার্সে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে আলোচনায় নতুন বিতর্ক– আওয়ামী লীগ কি ভোট বানচালে তৎপরতায় নেমেছে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছে?

কমিশনের প্রস্তাব: ঐকমত্য নয়, বিভাজনের নতুন সূচনা 
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বলেছে, সংসদ নির্বাচনের দিন বা তার আগে গণভোট আয়োজনের সুযোগ রাখা যেতে পারে। উদ্দেশ্য, সংবিধান সংস্কার নিয়ে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া।

কিন্তু এই প্রস্তাবেই তৈরি হয়েছে বড় রাজনৈতিক ফাঁটল। একদিকে কমিশন ঐক্য চায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো সেই ঐক্যের ভিত্তিতেই অনৈক্যে জড়িয়ে পড়েছে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। যদিও স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমিয়ে এনে ঐকমত্য তৈরি করাই ছিল কমিশনের মূল কাজ। তবে, সেখানে তারা সফল হয়েছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না। আর সফল হওয়ার সুযোগও আর নেই। কারণ তাদের মেয়াদ শেষ। ৩০টি রাজনৈতিক দলের ২৭০ দিনের ধারাবাহিক বৈঠকের পরও এমন পরিণতি অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশের জন-আকাঙ্ক্ষার বড় ধরনের হোঁচট।

বিএনপি: ‘নোট অব ডিসেন্ট বাদ দিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা’ 
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অযৌক্তিক।

দলটি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত উল্লেখ না থাকায় জাতীয় ঐকমত্যের পরিবর্তে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে।’

বিএনপির এই অবস্থান জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাদের আপত্তি বাস্তবায়ন প্রস্তাবে না থাকলে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক বৈঠক করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না। প্রশ্ন উঠে তাহলে কি ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকগুলো ছিল লোক দেখানো। যেহেতু কমিশনের মেয়াদ শেষ তাই বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে সংকটের সমাধান অন্তর্বর্তী সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে।

জামায়াত: ‘নভেম্বরেই গণভোট দিতে হবে’
বিএনপির বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন। দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ও গণভোট দুটি বিষয়ই রাজনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য। তাদের মতে, জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সংবিধান সংস্কার বৈধ হবে না।

অর্থাৎ, জামায়াত ও বিএনপি একেবারেই ভিন্ন পথে। এই মুহূর্তে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের এমন মুখোমুখি অবস্থান রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে পারে তাদের চরম অপ্রিয় প্রতিপক্ষ, কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগকে। কেননা দলটির বিদেশে পলাতক ও দেশে ঘা ঢাকা দেওয়া নেতাদের কথায় স্পষ্ট বোঝা যায়, কোনো একটি প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায় আওয়ামী লীগ। তাই ঐক্য না বিভেদ এই প্রশ্নে বিএনপি-জামায়তকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষের কথা মাথায় রেখে।

এনসিপি ও মধ্যপন্থীরা: ‘আলোচনার মধ্যেই সমাধান’
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং কিছু মধ্যপন্থী দল বলছে, গণভোট হোক, তবে সময় ও পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। তারা সরকার ও ইসিকে একত্রে বসার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, কমিশনের প্রস্তাব বাতিল নয়, বরং তা বাস্তবায়নের রূপরেখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

এনসিপিসহ কিছু মধ্যপন্থী দলের এই অবস্থান জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐক্যমতে আশার আলো দেখালেও বাস্তবে প্রধান দুই ফ্যাক্টর বিএনপি-জামায়াতের ওপর নির্ভর করছে সমঝোতা। কেননা, পুরোনো এই দল দুটি প্রথাগত রাজনীতির নিয়মে পুরোনো কায়দায় মাঠ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। যা তাদের শীর্ষ নেতাদের নতুন রাজনীতি নিয়ে প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মেলে না। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে হয়ত এনসিপিকে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে প্রকাশ্যে বা আড়ালে সমন্বয়কারীর ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। কেননা জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের প্রতি দুটি দলেরই শীর্ষ নেতারা অত্যন্ত নমনীয় ও সহানুভূতিশীল।

রয়টার্সে সাক্ষাৎকার: শেখ হাসিনার বক্তব্যে নতুন সংকেত?
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার দলকে বাইরে রাখলে নির্বাচন অর্থহীন হয়ে যাবে, এতে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বাড়বে।’

এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, এটা কি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির নতুন বার্তা?

বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি ভোটের আগে বৈধতা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারে সরাসরি ‘নির্বাচন বানচাল’ এর ইঙ্গিত না থাকলেও, এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক চাপ তৈরি ও রাজনীতিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষার কৌশলগত বার্তা।

সামনে কী হতে পারে: তিনটি সম্ভাব্য চিত্র
১. সমঝোতার পথ: সরকার, ইসি ও রাজনৈতিক দল একমত হলে গণভোট ও নির্বাচন একসঙ্গে করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।
২. বর্জনের পথ: বিএনপি গণভোট ও নির্বাচন দুটিকেই ‘অবৈধ’ ঘোষণা করলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও তীব্র হবে।
৩. রাজপথে উত্তেজনা: জামায়াত ও সমমনা কয়েকটি দল যদি গণভোটের দাবি নিয়ে রাজপথে নামে, আর বিএনপি বিপরীত অবস্থান নেয়, তাহলে রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিতে পারে। আর তখন এর সুযোগ নেবে স্থগিত আওয়ামী লীগ।

আইন উপদেষ্টার হতাশা 
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরবিরোধী ও উত্তেজিত ভূমিকা নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি এ রকম ভূমিকা নেন, সরকার কী করবে, আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। এত দিন আলোচনার পর যদি ঐকমত্য না আসে, তো আমরা আসলে কীভাবে কী করব, সত্যি আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে।’

এই বক্তব্যে আইন উপদেষ্টার হতাশা স্পষ্ট। তারপরও তার আশা স্বৈরাচারবিরোধী পক্ষগুলো আবারও জাতির বড় প্রয়োজনে এক হবে। যেমন হয়েছিল জুলাই আন্দোলনে। তিনি বলেছেন জুলাই সনদের বিষয়বস্তু নিয়ে বিরোধ মিটে গেছে এখন বিরোধ বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে। কিন্তু বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট একটি বড় বিষয় হলেও সেদিকে তিনি আলোকপাত করেননি। যা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোটে একটি বড় প্রশ্ন। বিএনপির এই বড় আভিযোগটির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি।

তবে, শেষমেষ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ওপরই ভরসা রাখতে চান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। হয়ত বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি একটি সমাধানের পথ বের করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বিএনপিও ছাড়ের মানসিকতায় থাকবে। কারণ, কোনো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বেশি ক্ষতি বিএনপিরই হবে। কেননা, নির্বাচন সামনে রেখে এরই মধ্যে সম্পন্ন হওয়া বেশ কয়েকটি জরিপে বিএনপিকেই এগিয়ে রেখেছেন ভোটাররা।

ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ হয়ত সদিচ্ছা থেকে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে তা রাজনৈতিক অনৈক্য আরও উসকে দিয়েছে। গণভোট প্রশ্নে বিএনপি-জামায়াতের বিপরীত অবস্থান, আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নির্বাচনের পথ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

নির্বাচনের আগে সবচেয়ে জরুরি বিষয় একটাই, গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সব দলের ঐকমত্য। অন্যথায়, ‘জাতীয় ঐকমত্য’ নামের এই উদ্যোগ ইতিহাসে ‘অনৈক্যের আরেক অধ্যায়’ হয়েই থেকে যাবে।

লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা

আসিফ-মাহফুজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তের দাবি

এনসিপিতে জায়গা না পেয়ে গণঅধিকার পরিষদে যেতে চান আসিফ, এখানেও বিরোধ

বিএনপির ভিশন প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন

সাদা কালো ভোটের জরিপগুলো কী বার্তা দেয়?

দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন

ফেইসবুক পোস্টে ‘চুদলিং পং’ কমেন্টকে কেন্দ্র করে ব্যাপক গু’লি

গাজীপুরে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় গাছা থানা বিএনপির দোয়া ও মিলাদ মাহফিল

রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতককে সারা রাত পাহারা দিল একদল কুকুর

খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় টঙ্গী পশ্চিম থানা তাঁতি দলের দোয়া মাহফিল

১০

ঐশ্বরিয়াকে বিয়ে করতে চান পাকিস্তানি মুফতি

১১

ভারতে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণ শুরু কামালকে দিয়ে

১২

গাজীপুরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের নতুন কমিটি গঠিত

১৩

মাদারগঞ্জে বিএনপির এক নেতার সমাবেশে শহীদ মিনারকে অবমাননা

১৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২ সপ্তাহ বন্ধ ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ

১৫

কুমিল্লায় ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ সন্দেহে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র গ্রেপ্তার

১৬

তারেক রহমানের ৬১ তম জন্মদিন উপলক্ষে গাজীপুরের গাছায় দোয়া ও মিলাদ

১৭

গাজীপুরে বিএনপি নেতা ফারুক হোসেনের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার

১৮

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফেসবুক স্ট্যাটাস

১৯

যশোরের শার্শায় মাদককারবারীর ছুরিকাঘাতে আহত পুলিশ সদস্য

২০